in

আমি নীল

– আপনাকে আমি গত পরশুদিন দেখেছি!
– কোথায় দেখেছেন?
– আপনি সিগারেট টানতে টানতে হাটছিলেন। আমার বাসার সামনে দিয়ে গেলেন।
– আপনার বাসা কোথায়?
– মির্জাজাঙ্গালের ওদিকে।
– আচ্ছা। হ্যা। আমার বন্ধু ওদিকে থাকে। তার বাসা ওদিকে। সেদিক থেকেই আসছিলাম।
– ওহ আচ্ছা আচ্ছা। কালকে আবার আসবেন?
– আসতে পারি। সিউর না। 
– কখন আসবেন?
– সেটাও জানি না। আপনার কোনো দরকার? আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে?
– কী? নাহ তো! আমি কখন বললাম? আর আপনি এত বেশি বুঝেন কেনো? আপনার ছেলেরা মেয়েদের ভাবেনটা কি? 
– এখনো কিছু ভাবি নি তো! যাই হোক, দেখতে না চাইলে নাই! আমি যাই, কাজ আছে আমার।

ফেসবুকে এজন্যেই থাকতে ইচ্ছে করে না আমার। বেশিক্ষণ থাকলেই সমস্যা। এই একটা জিনিস, চ্যাটিং। এত বাজে লাগে আমার কাছে যে বিশ্বাস করতে পারবেন না! আমার কাছে মনে হয়, কথাবার্তা বলার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হচ্ছে অনুভূতির প্রকাশ। যদি আপনি কথা বলার মাঝে অনুভূতিই প্রকাশ করতে পারলেন না তাহলে কথা বলেই বা কি লাভ? 
যাই হোক, অনেক্ষণ হলো সিগারেট ধরাই না। একটা সিগারেট ধরানো দরকার। একটা মজার ফ্যাক্ট বলি? সিগারেটের সবচেয়ে আনন্দকর মূহুর্ত হচ্ছে সিগারেট ধরানোর মূহুর্ত আর সিগারেটের শেষ চুমুক। সেই চুমুকে যতটা শান্তি পাওয়া যায় ততটা শান্তি দুনিয়ার খুব কম জিনিসেই পাবেন। সিগারেট ধরানোর সময় যদি লাইটার ব্যবহার করেন তাহলে সিগারেট ধরানোর মূহুর্তের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। সিগারেট ধরানোর নিয়ম হচ্ছে দেশলাই দিয়ে। দেশলাইয়ের কাঠিতে আগুন ধরলে সেই আগুন দেখতে যতটা সুন্দর মনে হয় ঠিক ততটাই স্বাদ সংরক্ষিত হয় যদি সিগারেট সেই আগুনেই ধরানো যায়। 
পাঠক-পাঠিকার হয়তো ভাবছেন, এত বকবক কে করছে। আর কেনো করছে? এই মানুষটার পরিচয়টা কি? বলছি, একটু অপেক্ষা করেন। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নিই। আপনাদের সাথে সিগারেট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমার হাতের সিগারেট নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কি আর করা!

আমি নীল। তবে শুধুই নীল না। আরিয়ান রহমান নীল। বাবা হূমায়ুন স্যারের ভক্ত ছিলেন। তারই সাথে ছিলেন হিমুর ভক্ত। বাবা চেয়েছিলেন আমিও যাতে হিমুর মতো উত্তর দিই “আমি নীল। শুধুই নীল”। কিন্তু সম্ভব হয় নি মা’র জন্যে। আমার মা’র কখনোই বাবার ওসব পাগলামী ভাল লাগতো না। মা বুঝতো না বাবার পাগলামী। আমি বড় হচ্ছিলাম। তখন ক্লাসের বইয়ের থেকে হিমু-টাইপ বই পড়িয়ে পড়িয়ে আমাকে বড় বানানো হয়েছে। শুধু হিমু টাইপের কাজ কিন্তু আমার মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া হয় নি। আমি ছোটো থেকেই ইতিহাস, ধর্ম, অ্যাস্ট্রোলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইনফরমেশন টেকনোলজি পড়ে পড়ে বড় হয়েছি। আমার সম্পর্কে একটা ছোটো তথ্য দিয়ে নিই এই ফাঁকে। আমি ৬ টা ভাষায় কথা বলতে পারি এবং ৮০ টার বেশি ধর্ম সম্পর্কে আমি একজন স্কলারের সমান জ্ঞানী!

তো যেটা বলছিলাম! আমার কথা বার্তা কিছুটা হিমু-টাইপ হতে পারে। ওসব নিজ গুনে ক্ষমা করে দেবেন। অনেকের কাছে হিমু মানেই পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী আর খালি পা! কিন্তু আমি ওমন নই কখনোই। ইছেও নেই ওইরকম হবার।

যাইহোক, আমার জন্ম হয় বাংলাদেশে কিন্তু আমি জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া চলে আসি। তাই বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার ধারণা কম থাকাটাই উচিত ছিল। কিন্তু আমি আসলে অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে যতটুকু জানি তার থেকে বেশিই জানি বাংলাদেশ সম্পর্কে। ওই যে জন্মভূমির প্রতি টান। বাবা মারা যাবার আগে আমাকে বাংলাদেশে ফিরতে মানা করেছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করি নি। বাবার কাছে কারণ জিজ্ঞেস করা মানে বিপদ ডেকে আনা। উনি কারণ বলতে বসলে কয়েক ঘন্টা এমনিতেই পার হয়ে যায়। তার মাঝে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা বাবার সাথে কথাও বলা যায় না। বাবা তার কয়েকদিন পরেই মারা যান। বাবা ছিলেন আমার শিক্ষক। জ্বি একমাত্র শিক্ষক যার থেকে আমি শিখিনি এমন কোনো কিছু নেই। কয়েকটা জিনিস বাদে। বাবা কেমিস্ট্রি পারতেন না। গণিতে কাঁচা ছিলেন। কিন্তু বাবার মতো শিক্ষিত মানুষ খুব কম ছিলেন। বাবার বন্ধুরা বাবার থেকেও ভালো ছাত্র ছিলেন। বাবা ছাত্রজীবনে খুব খারাপ ছাত্র থাকলেও ভবিষ্যতে বাবা এত পরিমান ঔজ্জ্বল্য লাভ করেন। তিনি উদ্যোক্তা ছিলেন, যার ফলে শেষ বয়সে সবকিছু গুছিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যান। মানে আমরা সবাই অস্ট্রেলিয়া চলে যাই। বাবার সবসময়ই ইচ্ছা ছিল প্রেম করে বিয়ে করার। কিন্তু পারেন নি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের মতেই বিয়ে করলেন। মা’র সাথে বাবার তাই মিললো না। বাবার একটাই দুঃখ যে উনি উনার বিয়ে পরবর্তী জীবনটা ঠিকভাবে কাটাতে পারছেন না। আমার মা আমাকে সবসময় বলতেন যাতে আমি সময় পেলেই বাংলাদেশ যাই। আমি তাই বাংলাদেশে।

ওহ আচ্ছা! আমার একটা বোন আছে। জান্নাতুল ফেরদৌস সাফা। উনি মায়ের আদর্শ মেয়ে হয়েছেন। একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে হেড অফ সিকিউরিটি এনালিস্ট হিসেবে জব করছেন অস্ট্রেলিয়ায়। আমার থেকে চার বছর বড়। উনি বাংলাদেশে আসেন দু এক বছর পর পর। আমি বাংলাদেশে এসেছি প্রথম বারের মতো। লাল জুতা, পিঠে একটা ট্রাভেলিং ব্যাগ, জিন্সের প্যান্ট আর কালো শার্ট। বাংলাদেশে আসার পর আমাকে কেউ নিতে আসে নি কেনো জানেন? কারণ আমি কাউকে জানাই নি যে আমি বাংলাদেশে আসছি। আমার বোন যেখানে হেড অফ সিকিউরিটি এনালিস্ট আমি সেই কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং কোম্পানির মূল মালিকানা ছিলো বাবা’র। বাবা মারা যাবার পর বোনকে সেই কোম্পানির মালিকানা দিয়ে যাননি কারণ বাবা মেয়েদের উপর বিশ্বাস করতে পারতেন না একেবারেই। তাই আমি ছোট হলেও আমাকে দিয়ে যান সব কিছুর দায়িত্ব। এই কোম্পানিতে আমার চাকরী জীবন শুরুর পর বোনের চাকরী জীবন শুরু হয়। কারণ বোন প্রথমে অন্য আরেকটা কোম্পানিতে জব করতো। পরে মা’র ইচ্ছায় আমাদের কোম্পানিতেই চাকরী শুরু করে। যাই হোক, টাকার গন্ধ আমাকে কখনো শুঁকতে হয় নি কষ্ট করে। বাবার যা সম্পত্তি আছে তা থেকেই বসে খেতে পারতাম কিন্তু চাই নি। নিজের জ্ঞান কে কাজে লাগাতে চেয়েছি। তাই ওতো বড় দায়িত্ত্ব টা হাতে নিয়েছিলাম।

বাংলাদেশে আসার পর সবচেয়ে আনন্দের ফিলিংসটা হচ্ছে, আমি যে বাংলাদেশে আছি সেটা এখনো আমার পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের কেউ জানে না। সাফাকেও এখনো জানাই নি। সে জানলে প্রথমেই আমাকে বকাবকি শুরু করবে আর পরে আমাকে তার বাসায় থাকতে হবে, যেটা আমার পক্ষে এখন সম্ভব নয়। আমি বাংলাদেশে এসেছি দুটো কারণে। প্রথমত, আমার এক কলিগ আমাকে একটা সমস্যা বলেছে। সেই সমস্যার সমাধান করাটা জরুরী। আর দ্বিতীয়ত, আমার বাংলাদেশের বৃষ্টি দেখতে ও বৃষ্টির ঘ্রাণ নিতে ইচ্ছে করছিলো। বৃষ্টির কথায় একটা মজার ফ্যাক্ট মনে পড়লো। বিভিন্ন এলাকার বৃষ্টির ঘ্রাণ একেকরকম। আর বৃষ্টির ঘ্রাণ আপনি তখনই পাবেন যখন আপনার ভেতরে যেকোনো একটা ইমোশন কাজ করবে। সেটা হতে পারে, রাগ, দুঃখ, একাকীত্ব, ভালোবাসা, রোমান্টিকতা ইত্যাদি। যার মধ্যে ইমোশন নেই সে বৃষ্টির ঘ্রাণ পায় না। আপনাদের কাছে মনে হতে পারে যে, আমার বাবা হিমুর এত বড় ভক্ত ছিলেন কিন্তু তারপরেও তিনি কেনো ইমোশনকে মেরে ফেলতে চান নি? যেখানে হিমুর বাবা বা হিমু নিজেই বারবার ইমোশনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে সেখানে আমার বাবা কেনো আমাকে ইমোশনকে ধরে রাখতে শিখিয়েছেন?

বাবাকে এই প্রশ্ন করেছিলাম দশম শ্রেণীতে থাকতে। বাবা উত্তর দিয়েছিলেন, “ইমোশন বা অনুভূতি আপেক্ষিক। তোমার রাগের কারণ আরেকজনের কাছে খুশির উদ্রেক ঘটাতে পারে। আবার তোমার ভালোবাসা আরেকজনের মাঝে হিংসার উৎপত্তি ঘটাতে সক্ষম। সুতরাং, ইমোশন নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কারন আপেক্ষিক জিনিস পরিবর্তনশীল। আর যেটা পরিবর্তনশীল অর্থাৎ যেটা ধ্রুবক নয় সেটা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেটা অবশ্যই এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তন করা যায়।” 
এই প্রশ্ন করার পর আমি ভাবছিলাম কেনো প্রশ্ন করতে গেলাম?

বাবাকে প্রশ্ন করতে গেলে এই এক সমস্যা। প্রশ্নের টপিক থেকে সরে এত দূরে চলে যাবেন তিনি যে শেষমেষ মূল টপিকই ভুলে যাবেন। তারপর হয় জিজ্ঞেস করবেন যে কি প্রশ্ন করেছি নাহয় তিনি জায়গা ছেড়ে উঠে চলে যাবেন। 
– প্রশ্নটা কি ছিলো? 
– ইমোশন মেরে ফেলা উচিত নয় কেনো?
– হ্যা, তো যা বলছিলাম। ইমোশন মেরে ফেলা উচিত নয় কারণ এটা আমাদের সাথে মিশে আছে। একেবারে শুরু থেকেই। একটা ঘটনা বললে বুঝতে পারবে কেন আমাদের মাঝে ইমোশন একেবারে ভেতরে জুড়ে আছে। ইসলাম ধর্মানুসারে, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করার সাথে সাথেই কিন্তু পৃথিবীর সব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। সেখানে আমাদের শরীরের কোনো আকার ছিলো না। শুধু আমাদের স্পিরিট বা আত্মা ছিলো। যেটাকে প্যারাসাইকোলজিতে বলে ‘স্পিরিট ওয়ার্ল্ড’। তো, আদমকে সবকিছু শিক্ষা দেয়ার সময় আল্লাহ আমাদের সব আত্মাদের একই রুমে ডাকলেন। কনফারেন্সের মতো করে। সেখানে আদমকে দেখিয়ে আল্লাহ বললেন, “আদম, এই হচ্ছে তোমার সকল বাচ্চাকাচ্চা। এরাই তোমার বংশধর”। হঠাত করে আদমের চোখ পড়লো একটা ছেলের দিকে। আদম আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহ, এই সুন্দর ছেলেটা কে? এর নাম কী?” আল্লাহ বললেন, “এ হচ্ছে দাউদ। এও তোমার মতো একজন নবী হয়ে জন্মাবে।” আদম বললেন, “সে কত বছর বাঁচবে?” আল্লাহ বললেন, “সে ৪০ বছর বাঁচবে”। আদমের সাথে সাথেই মন খারাপ হয়ে গেলো। এই প্রথম কোনো মানবের অনুভূতির প্রকাশ পেলো। আদম আল্লাহকে বললেন যে, “আল্লাহ, আমি ১০০০ বছর বাঁচবো। কিন্তু আমার ছেলে মাত্র ৪০ বছর বাঁচবে। তুমি আমার ছেলের আয়ু বাড়িয়ে দাও”। আল্লাহ বললেন, “এটা সম্ভব নয়। আয়ুর কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। কলম তুলে ফেলা হয়েছে। আর কখনো কারো আয়ু বাড়বে না, কমবে না।” আদম বললেন, “আল্লাহ, এই ব্যাপারটা খুবই খারাপ লাগছে আমার কাছে। আমি আমার ছেলেকে আমার আয়ু অর্থাৎ আমার ১০০০ বছর থেকে ৬০ বছর দান করলাম।” আল্লাহ বললেন, “ঠিক আছে। তাই-ই হোক!”
তো এই হচ্ছে মূল ঘটনা। যেটার কারণে শুরু থেকেই আমাদের মানুষের মাঝে অনুভূতি মিশে আছে। আমরা অনুভূতিকে মারতে পারবো না। নষ্ট করতে পারবো না। এটা এক ধরনের শক্তি। আর আমরা জানি যে, শক্তির কোনো ধ্বংস নেই। শক্তি অবিনশ্বর। শক্তি শুধুমাত্র এক রূপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তিত হতে পারে। আমরা শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। সেই অনুসারে অনুভূতি বা ইমোশনকেও মেরে ফেলা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 
– বুঝলাম!

মনে মনে ভাবছিলাম (আসলে ভাবছিলাম না, শপথ করছিলাম) যে, আর কোনোদিন বাবাকে কোনো প্রশ্ন করবো না। এক প্রশ্ন করতে গিয়ে আমার মধ্যে তিনি আরো একশটা জিনিস ঢুকিয়ে দিলেন।

তো, আমি জানি কি বলছিলাম? ওহ আচ্ছা! হ্যা! আমি বলছিলাম বৃষ্টির কথা। তো বৃষ্টির ঘ্রাণ নেয়ার জন্য সেই অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে এসেছি। আজকে নিয়ে পাঁচদিন হলো বসে আছি হোটেলের রুমেই। সেই মেয়ের সাথে দেখা করা দরকার। যাবো যাবো করছি কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না। কারণ, বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। স্যাঁতস্যাঁতে এই অবস্থায় আমার বাইরে বেরোতে একেবারেই ইচ্ছে করে না। জ্বি, আমি বৃষ্টির ঘ্রাণ পছন্দ করি কিন্তু বৃষ্টি নয়। অনেকটা উদ্ভট টাইপের ইমোশন আমার! 
যাই হোক, আজকে সন্ধ্যার পরে যাবো ভাবছি। মেয়েটার সাথে দেখা করা দরকার। তার সমস্যা সমাধান না করলে খুবই বিপদে পড়ে যাবে সে। এই মেয়ের নাম তিন্নি। সে নাকি কি সমস্যায় ভুগছে। তিন্নির কলেজ জীবনের এক বান্ধবী অস্ট্রেলিয়াতে আমার কোম্পানিতেই কাজ করে। সেই বান্ধবীর কাছেই শুনেছি তিন্নি মেয়েটা নাকি মানসিক রোগী। কিন্তু আমি যেটা দেখেছি সেটা দেখে মনে হচ্ছে না যে তিন্নি কোনো মানসিক রোগী। দেখা যাক, মেয়ের বাসায় যাওয়া দরকার।

আমাদের সম্পর্কের তিন বছর চলছে। দুঃখিত! সম্পর্কের বললে ভুল হবে। বিয়ের তিন নম্বর বছর চলছে। বিয়ের আগে আমাদের সম্পর্ক ছিলো প্রায় আট বছরের। পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষমেশ আমার বাবা মেনেই নিলেন। মাকে মানানো ততটা কষ্ট হয় নি। কিন্তু বাবাকে ওতটা সহজে মানানো যাচ্ছিলো না। যাই হোক! শেষমেষ নীলকে দেখার পরে, বাবা তাকে প্রথম যে প্রশ্নটা করেছিলেন, ‘তোমার বেতন কত?’ প্রশ্ন শুনে সে খানিকটা ভড়কে গিয়েছিলো। কিন্তু আমাকে ও বাবাকে চমকে দিয়ে যখন যে কথা বলতে শুরু করলো তখন আধ ঘন্টার মধ্যেই বাবা তার হবু মেয়ে জামাইকে মেনে নিলেন।
এসব ভাবতে ভাবতেই কপালের নীল টিপটা ঠিক করে লাগালো তিন্নি। আয়নায় নিজেকে দেখে একটু হিংসেই হতে লাগলো তার। শ্যামলা গায়ের এই মেয়েটা বর হিসেবে পেয়েছে এক রাজপুত্রকে। নিজেকে মাঝে মাঝে খুবই ভাগ্যবতী বলে মনে হয় তার। নীল, তিন্নির স্বামী; কখনোই কিছুতেই দেরী করে না। কখনোই তিন্নির কথা ফেলতে পারে না নীল। তিন্নির অমান্য কখনোই হবে না সে। হয়ও নি।

এমন একটা ছেলেকে নিজের আঁচলে বাধতে পেরে তিন্নির মাঝে মাঝে নিজেকেই বিশ্বাস হয় না। তিন্নির জন্মদিন হোক কিংবা ভালোবাসা দিবস, যখন তিন্নির যেটা প্রয়োজন সেটা বলার আগেই করে ফেলে নীল। কলিংবেল বাজতেই তিন্নি দৌড়ে এসে দরজা খুলে দাঁড়ালো।
নীল – ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা!
তিন্নি – অনেক ভালোবাসি তোমাকে, নীল। 
নীল – সেইম টু ইউ। এই নাও তোমার গিফট। এখন চলো খেয়ে নিই তো। অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।
তিন্নির বাবা এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। 
তিন্নি – কি হয়েছে বাবা? 
তিন্নির বাবা – মা তোর কি হয়েছে? কবে এসব ছাড়বি? 
তিন্নি – কি হবে আমার বাবা? আমি আর নীল কত সুখে আছি দেখো! 
তিন্নির বাবা – কোথায় নীল?
তিন্নি – নীল? নীল! নীল! ও মনে হয় ঘুমে। অফিস থেকে এসেছে তো তাই রেস্ট নিচ্ছে। ক্লান্ত অনেক। এই দেখো আমাকে গিফট এনে দিয়েছে।
তিন্নির বাবা গিফটের দিকে তাকিয়ে ভড়কে গেলেন। তিন্নিকে এইবার ভালোবাসা দিবসে তিনি একটা শাড়ি গিফট করেছেন। কিন্তু সেটার রঙ ছিলো হলুদ। তিন্নির হাতের এই শাড়ির রঙ নীল। এই শাড়ি কে দিলো? বাসায় তো তিনি আর তার মেয়ে ছাড়া আর কেউ থাকে না।
তিন্নির বাবা (ভীত চোখে) – এই শাড়ি তোকে নীল গিফট দিয়েছে? 
তিন্নি – হ্যা বাবা। 
তিন্নির বাবা – আমি তোকে যে শাড়ি গিফট করেছি সেটা কোথায়? 
তিন্নি – ওই যে বিছানায় দেখো।
তিন্নির বাবা সেই শাড়ি তুলে দেখলেন, শাড়ির রঙ হলুদ। এবার তিন্নির বাবা থমকে গেলেন। ভীত চোখে তিন্নির রুমের দরজা বন্ধ করে বাইরে এসে সিগারেট ধরালেন।
আশফাক সাহেব সবকিছু ঘোল পাকিয়ে দিচ্ছেন। আসলে সবকিছু ঘোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তিনি শুরু থেকে ভাবতে শুরু করলেন!

তার মেয়ে তিন্নি গত চার বছর ধরে ‘ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’ নামক একটি মানসিক রোগে ভুগছে বলে তিনি জানেন। তিন্নির প্রথম সাইকিয়াট্রিস্ট তাকে এটা বলেছেন। এই রোগে, রোগীরা নাকি যেকোনো ইমোশন বা স্মৃতি থেকে যেকোনো একটি চরিত্রকে ট্রিগার করে তাকে ধরে বাঁচতে চায়। আর সেভাবেই তারা স্বপ্নের মতো একটা রাজ্য তৈরি করে যেখানে তারা নিজেদের সেই ব্যক্তিকে নিয়ে বাঁচতে পারে। সেই ডাক্তার যখন এই তত্ত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসা থেকে বের হতে চেয়েছেন তখনই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। তারপর অন্য আরেকজন ডাক্তার আসলেন। তিনি এসে তিন্নিকে দেখে বললেন, ‘এই মেয়ে সোল্ডারস হার্ট নামক এক ধরণের পিটিএসডি রোগে ভুগছে। এটা মানসিক রোগের মধ্যেই পড়ে। তবে খুবই ভয়ানক আর বিরল। এর চিকিৎসা প্রায় নেই বললেই চলে’। সেই ডাক্তারও বাসা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতেই গাড়ির ট্যাংক ফেটে গিয়ে আগুনে পুড়ে মারা যান। এভাবে আরো তিনজন ডাক্তার নিয়ে আসার পরেও তিন্নির আসল রোগ কেউই ধরতে পারে নি। বরঞ্চ সেই তিন ডাক্তারও অপঘাতে মারা গেলেন।

কলিংবেল বেজে উঠলো। আশফাক সাহেবের চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটলো। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সিগারেট ফেলে দিলেন। দরজা খুলতেই দেখলেন সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়া শুকনো মতন একটা লোক দাঁড়িয়ে আছেন।
“আমি নীল। আপনার মেয়ে খুবই সমস্যায় আছে। আমি জানি। আপনার মেয়ে কোনো সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে ভুগছে না। আপনার মেয়ের সুপারন্যাচারাল ক্ষমতা আছে। জানি এই কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয় কিন্তু তারপরেও আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া আপনার আর কোনো উপায় নেই। অলরেডি আপনার এই বোকামির জন্য বেশ কয়েকজন ডাক্তার মারা গেছেন আপনার বাসার আশেপাশেই। তাদের আত্মা এখনো আপনার আশেপাশেই ঘুরছে। হোস্ট পেলে সেসব আপনার ঘাড় মটকাতে দেরী করবে না”।
এতটুকু অবধি শুনেই ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলেন আশফাক সাহেব। আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, “কোথা থেকে আসে এসব উল্টাপাল্টা মানুষ!”

আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে যেভাবেই হোক তিন্নির সাথে কথা বলতেই হবে। নাহলে সামনে তিন্নির বিপদ। অনেক বিপদ।

সিগারেট প্রায় শেষের পথে। আশফাক সাহেব ছেলেটার কথা মাথা থেকে সরাতে পারছেন না। আশফাক সাহেব ভাবছেন তিনি গিয়ে ছেলেটার সাথে কথা বলবেন কি-না। ছেলেটা তার নাম যেনো কি বলেছিলো? মাথায় আসছে না তার। শুঁকনো কাশি দিয়ে মেয়ের রুমের বাইরে থেকে একবার দেখে আসলেন তিনি। নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় হেলান দিলেন। চোখ লেগে আসছে তার। হঠাত একটা চিৎকার। দৌড়ে মেয়ের রুমে গিয়ে দেখেন, তিন্নি জানলার কাঁচ দিয়ে হাত কেটে ফেলেছে। 
– মা তুই এমন করলি কেন? (তিন্নির কাটা হাত চেপে ধরে)
– তুমি আমাকে এই রুমে আটকে রাখলে কেনো?
– আমি তোকে আটকে রাখি নি মা। 
– তাহলে আমি এই রুমের বাইরে যেতে পারি না কেন? আমাকে নীল বলেছে ওর সাথে দেখা করতে! 
– নীল? (আশফাক সাহেব ভাবলেন, বাইরে ছেলেটাতো এটাই বলেছিলো তার নাম। এটা কোনো কো-ইন্সিডেন্স?)
– হ্যা বাবা, ও বলেছে ও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি নাকি তাকে বাসায় ঢুকতে দাও নি। 
আশফাক সাহেব কিছু না বলে মেয়ের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। মেয়েকে বললেন শুয়ে থাকতে।

আশফাক সাহেব কিছুতেই সূত্র মেলাতে পারছেন না। আশফাক সাহেবের বাসাটি দুতলা। তার মধ্যে মেয়ে থাকে নিচতলায়। আশফাক সাহেবও নিচতলাতেই থাকেন। তিন্নির মা মারা যাবার পরে দুতলায় আর কেউ থাকেন না। তিন্নির রুম বাসার উত্তর দিকে। আর বাড়ির মূল দরজা দক্ষিণে। দরজার বাইরে কি হচ্ছে সেটা জানার দুটো পথ রয়েছে। যার মধ্যে একটা হচ্ছে দরজা খুলে দেখা আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে দুতলায় যাওয়া। উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে দরজার বাইরে কি ঘটছে সেটা জানার কোনো প্রশ্নই উঠে না। তাহলে তিন্নি জানলো কীভাবে বাইরের ছেলেটার কথা? দুই তলার মূল গেইটের চাবি শুধুমাত্র আশফাক সাহেবের কাছেই আছে। যার ফলে দুতলায় যাওয়া সম্ভব নয়। আর মূল দরজা তিনি নিজে তালা মেরে এসেছেন। আর এখনো মূল দরজাতে তালা দেয়াই আছে। তাহলে? 

আশফাক সাহেবের মাথা ঘুরছে। তিনি আর কিছু ভাবতে পারছেন না। এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে। তিন্নি হয়তো এমন কিছু বলেছে যেটা ঘটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য ছিলো কিন্তু তারপরেও সেটা ঘটেই গেলো। কিন্তু আজকে একটু বেশিই হয়ে গেলো। প্রথমে শাড়ি আর তারপরে এই ঘটনা। আর তারপরেই আবার রাত বিরাতে হাত কাটাকাটি। আশফাক সাহেব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ১১ টা বেজে ১৯ মিনিট। তিনি সিগারেট ধরালেন। আসলে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বাইরে ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে? নাকি চলে গেছে? আর যদি দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে দরজা খোলা কি উচিত হবে?

এসব ভাবতে ভাবতে সিগারেটের আগুন পড়ে গেলো। আবার তার চোখ লেগে আসছে। খাওয়া দাওয়া করা দরকার। হোটেল থেকে খাবার দিয়ে গেছে প্রায় ২০ মিনিট আগে। টেবিলের উপর খাবার পড়ে আছে কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষন আগেও দেখে এসেছেন টেবিলের পাশেই তেলাপোকারা খাবারের উচ্ছিষ্টের জন্য জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছে। তার আবার ক্ষিধেও লেগে যাচ্ছে। হঠাত তিনি তিন্নির ঘর থেকে ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পেলেন। তার কাছে মনে হচ্ছে বেশ স্পষ্টভাবেই কে যেনো কথা বলছে। তিন্নির গলার আওয়াজ তিনি শুনেছেন কিন্তু কখনো তিন্নি যে ছেলের কথা বলে সেই ছেলের আওয়াজ শুনেন নি। আজকে সেটাও শুনতে পাচ্ছেন। হ্যালুসিনেশন ভেবে ওভাবেই বসে থাকলেন। কিন্তু নিজের মনকে মানাতে পারছেন না। স্পষ্ট শুনতে পেলেন কে যেনো কথা বলছে তিন্নির সাথে। তিনি নিভে যাওয়া সিগারেটটাতে আবার আগুন ধরিয়ে তিন্নির রুমের দিকে হাটতে থাকলেন। বাইরে থেকে দেখলেন। কেউ নেই। ভেতরে যাওয়ার জন্য দরজায় ধাক্কা দিতেই আশফাক সাহেব মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।

সিরিয়াসলি? এতক্ষণ ধরে বসে আছি বাইরে অথচ একটাবারের জন্যেও লোকটা এসে দেখলো না? ১১ টার মতো বাজে হয়তো। আমি ঘড়ি বা মোবাইল কিছুই রাখি না। আমার পকেটে একটা নোটবুক আর একটা লাইটার ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ঘড়ি রাখি না কারণ সময় দেখতে ইচ্ছে করে কিছুক্ষণ পর পর। আর সময় দেখলে মানুষ নাকি অস্থির হয়ে যায়। আর মোবাইল বাসায় রেখে এসেছি। নাহলে যে কাজ করতে যাচ্ছি সেটার জন্যে মোবাইল নিয়ে আসাটা ততটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। 
আমি চাইলে অবশ্য বাসায় ঢুকতে পারবো। বিল্ডিংয়ের বাম দিকে একটা গাছ আছে। সেটা বেয়ে দুতলায় যাওয়া যাবে কিন্তু দুতলায় আলো জ্বলতে দেখছি না। মনে হয় দুতলায় কেউ নেই। কিন্তু আমার ভেতরে যাওয়া খুবই দরকার। নাহলে তিন্নির সমস্যার সমাধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু ভেতরে যাবো কীভাবে?

তিন্নি ঘুম থেকে উঠেই দেখে আশফাক সাহেব মাটিতে পড়ে আছেন। আশফাক সাহেবের পাশে নীল দাঁড়িয়ে আছে। তিন্নি দৌড়ে এসে নীলকে জড়িয়ে ধরে। 
তিন্নি – বাবার কি হয়েছে? বাবা এখানে পড়ে আছে কেন?
নীল – সেটা আমি কি করে জানবো? তুমি হাত কাটলে কেন? 
তিন্নি – বাবা আমাকে তোমার সাথে দেখা করতে দিচ্ছিলো না। তাই হাত কেটেছি। তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে। অথচ বাবা তোমাকে ভেতরে আসতে দেন নি। 
নীল – বাবার দোষ না এটা। তুমি আমাকে দেখতে পাও কিন্তু বাবা তো আমাকে দেখে না তাই না?
তিন্নি – হ্যা! তাও ঠিক। কিন্তু তারপরেও বাবা আমাকে বিশ্বাস করে না যে!
নীল – বাবা বিশ্বাস করবে। একটু সময় দাও। তোমার বাবাকে ডেকে তোলো। উনাকে বলো বাইরে দরজা খুলতে। দরজা খুললে একটা লোক আসবে। তাকে সবকিছু খুলে বলবে। তাহলে সে তোমাকে ভালো করে তুলবে। 
তিন্নি – কিন্তু আমি যদি তাকে সব খুলে বলি তাহলে তোমাকে তো আমি আর দেখতে পাব না।
নীল – হ্যা। আমাকে দেখবে না। কিন্তু মজার ব্যাপার জানো কি? উনার নামও নীল। উনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আমাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারেন। 
তিন্নি – আচ্ছা। কিন্ত বাবা যদি না শোনে? 
নীল – বাবা শুনবে। তুমি ডাক দাও! 
তিন্নি আশফাক সাহেবকে ডেকে তুললো। আশফাক সাহেব মাথায় হাত দিয়ে উঠে বসলেন। উঠতেই তিন্নিকে বললেন, “মা, আমি জানি না আমি কি করেছি! এই নে চাবি। বাইরের ছেলেটাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে আয়।”

দরজা খোলার শব্দে একটু নড়েচড়ে বসলাম। দরজা খুলতেই দেখি সুন্দরী এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মেয়েটার শরীরের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কতদিন ধরে কেউ মেয়েটাকে ভালোবাসেনি। আমার বাবা বলতেন, “কেউ খেয়েছে কিনা সেটা চেহারা বা শরীর দেখে বোঝা না গেলেও অনুভূতির অভাব শরীরের প্রত্যেক হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়”। 
তিন্নি – বোকার মতো তাকিয়ে আছেন কেন?
আমি – আপনি তিন্নি? 
তিন্নি – জ্বি। বাবা আপনাকে ডেকেছেন। 
আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, “বাবা ডেকেছেন নাকি নীল বলেছে দরজা খুলতে!” তিন্নি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আমি তার পাশ দিয়েই হেঁটে চলে আসলাম। মানুষকে হঠাত করে অবাক করে দেয়ায় আনন্দ আছে। তাদের কাছে মনে হবে আপনি মহাপুরুষ টাইপের কিছু। কিন্তু আসলে আপনি যে ঢং করতে পারেন আর অভিনয় করতে পারেন সেটা তো তাদের ধারণার বাইরে। ঢোকার সাথে সাথেই আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হতে লাগলো। মনে হচ্ছে দুইতলা এই বাসায় কয়েক বছর ধরে কাউকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দুতলা অনেকদিন ধরেই বন্ধ। কারণ সিড়ির মাঝে ধুলো জমে আছে। সেই ধুলোতে অনেকদিন ধরেই কারো পা পড়ে নি সেটা সিড়ির দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে।

নিচতলায় শুধুমাত্র দুটো বাতি। মনে হয় ৫০ থেকে ৮০ ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। যতই তিন্নির রুমের দিকে তিন্নি আমাকে নিয়ে চলছে ততই ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে তিন্নির রুমের পেছনে বা আশেপাশে কোথাও ঘন জঙ্গল রয়েছে। তিন্নির বাবা উঠে এসে আমাকে ধরে বসালেন। তারপর আমাকে বললেন, “বাবা, আমার মেয়ে তোমাকে সব বলবে। কি হয়েছে। কি ঘটছে সবকিছুই। কিন্তু বাবা তুমি আমাকে কথা দাও তুমি আমার মেয়েকে ভালো করে দেবে।” আমি জ্ঞানীদের মতো ভঙ্গি করে বললাম। আসলে জ্ঞানী বললে ভুল হবে। আমি সন্ন্যাসীদের মতো ভাব ধরে বললাম, “যা হয় ভালোর জন্যেই হয়। আপনার মেয়েকে ঠিক করার ক্ষমতা শুধুমাত্র ইশ্বরের হাতে। ইশ্বরে বিশ্বাস রাখুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আসলে অভিনয় করার আনন্দই অন্যরকম। মানুষ অভিনয় করতে পছন্দ করে। তবে এই পছন্দের সীমা পিশাচের মতোই হয়ে যায় যখন কেউ পুরো ঘটনা আগে থেকে জেনে ফেলে আর তারপরে সেটা নিয়ে আনন্দ করে, ভাব ধরে। এই ভাবের সীমা তখন ছাড়িয়ে যায়। সব জেনে না জানার ভান করার আনন্দ অন্যরকম। 

তিন্নি আমাকে সব ঘটনা বলতে শুরু করলো। যদিও আমি প্রায় বেশিরভাগ ঘটনাই জানি। তিন্নি ঘটনা বলতে থাকুক। আমি আপনাদের বলি আমি কীভাবে তিন্নির সম্পর্কে জেনেছি। তিন্নির বান্ধবী মানে আমার কলিগ আমাকে বলেছে তিন্নির ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার সম্পর্কে। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডারের রোগীরা যেকোনো ইমোশন বা স্মৃতি থেকে যেকোনো একটি চরিত্রকে ট্রিগার করে তাকে ধরে বাঁচতে চায়। আর সেজন্যে তারা স্বপ্নের মতো একটা রাজ্য তৈরি করে যেখানে তারা নিজেদের সেই ব্যক্তিকে নিয়ে বাঁচতে পারে। কিন্তু তিন্নি নাকি ভবিষ্যৎ দেখতে পারে। আর এটা নিয়ে তিন্নির বান্ধবী খুব বেশি ভয় পেয়েছে। তার কাছে মনে হয় তিন্নির নাকি খুবই গুরুতর মানসিক সমস্যা আছে। কলিগের মুখে এসব শুনে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তিন্নি তাকে কখনো কোনো উপহার দিয়েছে কি না? সে অবাক হয়ে আমাকে একটা কলম দেখালো যেটা তিন্নি তাকে কলেজে থাকতে জন্মদিনে উপহার দিয়েছে। অনেক বোঝানোর পর তিন্নির দেয়া উপহার নিয়ে আসতে পারলাম আমার কাছে। সেদিন রাতেই আমি তার সেই কলম দিয়ে ‘রিগেইন মেমোরি অ্যাক্সেসেবল’ মন্ত্রের দ্বারা জাদু করি। এই ধরণের জাদুতে আপনি একটা নির্দিষ্ট বস্তু বা ব্যক্তিকে কারো সেন্টারে রেখে তার সম্পর্কে তথ্য বের করতে পারবেন। তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে না জানা গেলেও অতীত সম্পর্কে জানা যায় এই ধরণের জাদু-মন্ত্রের দ্বারা।

আপনারা হয়তো জানেন না যে, আমি ক্লায়রোভয়েন্স। মানে আমি স্পিরিট ও জ্বীন বা ডেমনের শব্দ শুনতে পাই। তাদের অস্তিত্ব আমি টের পাই। আমি জন্মের সময়েই এই ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছি। যেই ক্ষমতার কারণে আমার মা আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। বড় হতে হতে বাবাই আমাকে আমার এই ক্ষমতা সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তিনিই আমাকে সবকিছু শিখিয়েছেন। তিনিই আমাকে সবকিছু বুঝিয়েছেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, “আমার এই ক্ষমতার উৎস কি? কেনো শুধু আমিই তাদের শব্দ শুনতে পাই?” সেদিন বাবা বলেছিলেন যে, তিনিও তাদের শব্দ শুনতে পান। তখন জানতে পারি যে, বাবা আসলে মুসলিম ছিলেন না। তিনি জন্মগত মুসলিম হলেও তিনি আসলে স্যাটানিস্ট ছিলেন। সহজ বাংলায় শয়তানের পুজো করতেন। মার সাথে এই ব্যাপার নিয়ে বাবার অনেক ঝামেলা চলতো। বাবা এমনিতে অনেক শান্ত শিষ্ট আর ধৈর্যশীল ব্যক্তি ছিলেন। উনার মতো ধৈর্যশীল ব্যক্তি খুব কমই ছিলো। যাই হোক, শেষমেষ একদিন রাগে ক্ষেপে গিয়ে বাবা, মাকে অভিশাপ দিয়ে বসেন। রাগের বসে বাবা, মার উপর স্পিরিট পোসেসড করার সুযোগ করে দেন। মা সেদিন রাতেই আমাকে জন্ম দেন। আর আমি সেই স্পিরিট নিয়ে জন্ম নিই। মা সেই ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে মারা যান। আর আমি জন্ম নিই দুনিয়ার সবচেয়ে অল্প ইমোশনের মানুষ হিসেবে। জন্ম থেকেই সে আমার সাথে। তার সাথে আমি কথা বলতে পারি না। কিন্তু সে আমাকে বোঝে, আমিও তাকে বুঝি।”

আমি যেনো কোথায় ছিলাম? ওহ আচ্ছা। তিন্নি এখনো বকর বকর করেই যাচ্ছে। যাই হোক, তো আমি সেদিন সেই মন্ত্রের দ্বারাই তিন্নির সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাই। তিন্নির সমস্যার সমাধান করা আসলে সম্ভব নয়। আমার পক্ষে তো দূরের কথা আমার বাবার পক্ষেও সম্ভব নয়। তবে কিছু একটা তো করতেই হবে। কারণ তিন্নি নিজেও জানে না যে, সে পোসেসড। তার ভেতরে এমন একটা ডেমন লুকিয়ে আছে যেটা তিন্নির শরীরকে হোস্ট বানিয়ে ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই ডেমনকে এত সহজে ছাড়ানো সম্ভব নয়। দুনিয়ার কোনো ওঝাই এটাকে নিরাময় করতে পারবে না। তাহলে আমি কীভাবে তিন্নিকে বাঁচাবো? নাকি তিন্নিকে মারা যেতেই হবে! তিন্নির কপালে কি লেখা আছে!
আচ্ছা, এতদিনে তো তিন্নিকে মেরে ফেলার কথা ঐ ডেমনের। ডেমন পোসেশনের পরে সাধারণত ১ বছরের মধ্যেই হোস্ট মারা যায়। তাহলে তিন্নিকে কেনো সে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে আর কেনইবা সে আমাকে ডেকে আনতে বললো? তবে আমিই কি এই সমস্যার মূল?

আমার বাবার আইকিউ ছিলো ৭০ এর মতো। ১০০ এর মাঝে আইকিউ মাপা হয়। আপনাকে বিভিন্ন বিষয়ের ২০ টি প্রশ্ন করা হবে। প্রত্যেক প্রশ্নের মান ৫ করে।
বাবা কেমিস্ট্রি ও গণিতে কাঁচা ছিলেন। বাবা আমাকে এমনভাবে সবকিছু শিখিয়েছেন যাতে আমার আইকিউ ৯০ এর বেশি হতে পারে। কিন্তু আমি আইকিউ পরীক্ষাই দিই নি। বাবা আমাকে সবকিছু শেখানোর আগেই মারা যান। বাবার রিলেশন ছিলো অনেকগুলো। বাবার সাথে অনেক ফ্রি ছিলাম আমি। তাই বাবা প্রায় সবকিছুই আমাকে বলতেন। 

বাবার শেষ বান্ধবীর সাথে বাবার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেই মেয়ের পরিবার বাবাকে মেনে নেয় নি। অনেক কিছুই করেছেন বাবা। শেষ পর্যন্ত বাবা ব্ল্যাক ম্যাজিকও করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু এতে সেই মেয়ে মারাও যেতে পারে, এটা ভেবে আর করেন নি। আর যারা কালোজাদু করে তারা কখনোই নিজের কোনো উপকারে সেটা ব্যবহার করতে পারে না। এটাই নিয়ম। আর তাই বাবা বারবার বুঝিয়েও মেয়েটাকে আটকে রাখতে পারেন নি। শেষমেষ মেয়েটা বেশ খুশি মনেই বিয়ে করে নিয়েছিলো অন্য আরেকটা ছেলেকে। বাবা বিকেলবেলা নাকি মেয়েটার দেয়া অডিওগুলো শুনতেন একা বসে।
যাই হোক, বাবা শেষমেশ অন্য আরেক মহিলাকে মানে আমার মাকে বিয়ে করেন। অনেক অনিচ্ছা সত্যেও বিয়ে করতেই হলো। বিয়ের পরে আমি ১ বছরের মধ্যেই দুনিয়ায় চলে আসি। মা ডায়েরী লিখতেন। মা এই এক বছরে বাবাকে যথেষ্ট সহ্য করেছেন। কারণ মা আমাকে উনার লেখা ডায়েরীতে সবকিছুই বলে গিয়েছেন। এমন অনেক কিছুই বলেছেন যা বাবা আমাকে জানাতে চাইতেন না। আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মা মারা গেলেন। 

বাবাকে আজকে খুব মিস করছি। কারণ বাবা থাকলে হয়তো এই সমস্যার সমাধান এতক্ষনে হয়েই যেতো। কারন আমার কাছে মনে হচ্ছে তিন্নিকে বাঁচানো সম্ভব নয়। কারণ সেই ডেমন বা জ্বীন তিন্নির ঘাড়ে বেশ ভালোভাবেই চেপে বসেছে। তিন্নিকে এতদিনে মেরে ফেলার কথা। কিন্তু মারে নি। আবার সেই ডেমন আমাকেও ডাকছে বারবার। তিন্নিকে দিয়ে বারবার আমাকে মেসেজ পাঠানোর চেষ্টা করছে। আমার ধ্যানে বসা দরকার। দেখা দরকার আশেপাশেই কেউ আছে কিনা।

এক্সোরসিজম শুরু করতেই দমকা হাওয়ায় পর্দা দুলতে লাগলো। তিন্নি তার বাবাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। এক্সোরসিজমের সময় কাউকে একা রাখতে হয় না। কারণ এক্সোরসিজম হচ্ছে কোনো আত্মা বা ডেমনকে কোনো স্থান, বস্তু বা জীব থেকে আলাদা করে সেটাকে দোযখের আগুনে ছুড়ে ফেলা। আশেপাশে জানলার কাঁচ এমনভাবে শব্দ করছে যেনো মনে হচ্ছে ভূমিকম্প হচ্ছে। তিন্নি এক কোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তিন্নির পাশে তিন্নির বাবা তিন্নিকে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তিন্নির বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি তিন্নির চেয়েও বেশি ভীত। তার চোখ ফানুসের আগুনের মতো দপ দপ করে জ্বলছে।

আমি মন্ত্র পড়তে শুরু করলাম। সাদা দেয়ালে কালো লেখা ভেসে উঠছে। দেয়াল ঘেষে ধোঁয়ার মত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। এই ধোঁয়া সাধারণ কিছু নয়। আমরা এক্সোরসিস্টরা এটাকে বলে থাকি স্মোক অফ দ্যা স্পিরিটস। এটা দেখতেই তিন্নি আর তার বাবাকে চোখ বন্ধ করতে বললাম। তারা চোখ বন্ধ করলেও আমি চোখ বন্ধ করি নি। আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম সেই স্পিরিটদের সাথে।
এই ধোঁয়াগুলো কিন্তু আপনার সাথে কথা বলবে না। জ্বীন বা ডেমন কিংবা স্পিরিটরা সাধারণত দুটো পর্যায়ে থাকতে পারে, হোস্ট স্টেপ আর স্পিরিট স্টেপ। হোস্ট স্টেপে থাকলে স্পিরিটরা আপনার সাথে যে কারো রুপ ধরে কথা বলবে কিংবা কারো উপর পোসেসড হয়ে কথা বলবে। আর স্পিরিট স্টেপে থাকলে তারা আপনার সাথে টেলিপ্যাথিক্যালি যোগাযোগ করবে। টেলিপ্যাথি হচ্ছে একজনের মনে আরেকজনের কোনো তথ্য পাঠানো অথবা কথা না বলে কিংবা ইশারা ইঙ্গিত ব্যবহার না করে একজনের সাথে আরেকজনের যোগাযোগের মাধ্যম। 

ডেমনগুলোকে আমি শুনতে পারছি। ক্লায়রোভয়েন্সরা এমনিতেই জ্বীন বা ডেমনের শব্দ শুনতে পারে, তাদের অস্তিত্ব টের পায়। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কান্নার আওয়াজ, চিৎকার, তাদের অনুভূতি টের পাচ্ছি আমি। কাঁদতে পারছে না কিন্তু চিৎকার করছে তারা। আমি আর পারছি না। চোখ খুলতেই আমার মাথায় প্রচন্ড জোরে আঘাত অনুভব করলাম। তারপরে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।

জ্ঞান ফিরতেই দেখি আশপাশ অন্ধকার হয়ে আছে। দূর থেকে চিৎকার শুনতে পারছি, এখনো। বুঝতেই পারছি না জ্ঞান ফিরলো নাকি স্বপ্নে আছি। দরজার বাইরে পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আলো দেখা যাচ্ছে। ঘ্রাণ পাচ্ছি বাতাসের। বৃষ্টি শুরু হবে মনে হয়। বৃষ্টি শুরু আগে বাতাসে বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া যায়। এই পূর্বাভাস আসে ঘ্রাণের মাধ্যমে। সুতরাং বৃষ্টি আসবে বোঝাই যাচ্ছে। আর একইসাথে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, আমি স্বপ্নে নেই। স্বপ্নে আপনি রঙ দেখতে পাবেন। কথা বলতে পারবেন। কিন্তু ঘ্রাণ পাবেন না। যদিও স্বপ্নের অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ধাপে আপনার ভিন্ন ভিন্ন অনুভুতির প্রকাশ পাবে।
দরজার পাশে শব্দ ধীরে ধীরে বাড়ছে। দরজা খুলে, দরজার ওপাশে আশফাক সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। 
আশফাক সাহেব – নীল সাহেবের ঘুম হয়েছে ভালো মতো?
আমি – জ্বি! বেশ ভালো ঘুম হয়েছে। আজকে রাতে আর ঘুমাতে হবে না।
আশফাক সাহেব – আপনি বুঝে গিয়েছেন সবকিছুই। তাই না?
আমি – জ্বি। চোখ খুলতেই যে আপনিই আমাকে মেরেছেন সেটাও বুঝেছি। আর আপনার মেয়ের এই অবস্থার জন্য আপনিই যে দায়ী সেটাও বুঝেছি। 
আশফাক সাহেব – বাহ। বেশ তো! তাহলে আপনার কাজ এখানেই শেষ! এখন আপনাকেও যে বাকিদের মতো মারা যেতে হবে!
আমি – অবশ্যই। কীভাবে মারবেন ঠিক করেছেন?
আশফাক সাহেব – বাকিদের যেভাবে মেরেছি সেভাবেই মৃত্যু দেবো বলে ঠিক করেছি।
আমি – ঠিক আছে। কিন্তু আপনার কি মনে হয় যে, আমি ইচ্ছে করেই এভাবে মাথা পেতে মৃত্যু নিয়ে নিচ্ছি! কিন্তু কেনো করছি? বলতে পারবেন? 
আশফাক সাহেব – প্রথম কথা হচ্ছে, আপনার হাত পা বাঁধা। যার ফলে আপনার পক্ষে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আপনার পক্ষে এখান থেকে বেঁচে যাওয়াও সম্ভব নয়। কারণ আপনাকে যেভাবেই হোক, আজকেই মরতে হবে যে! আমাকে ‘নিরন’ সবকিছু বলে দিয়েছে। আপনি কি কি বলতে পারেন সবকিছুই। তো আমি ভবিষ্যৎ জেনেই আপনাকে ডেকেছি। 
আমি (মুচকি হেসে) – আচ্ছা। কিন্তু ‘নিরন’ আপনাকে কিছু কথা বলতে ভুলে গিয়েছে। সেটা হচ্ছে, আমার হাত না বেঁধে মুখ বাঁধা উচিত ছিলো। আর দ্বিতীয়ত, আপনার উপর যে ডেমন পোসেস করেছে সেটার নাম বলতে নিষেধ করে দেয় নি। ভালো থাকবেন! দোযখে দেখা হবে আবার!

তিন্নি তার রুমে শুয়ে আছে। সম্ভবত জ্ঞান নেই তার। সে আরো শুকিয়ে গেছে। আমার গলায় ঝোলানো লকেটটা তিন্নির গলায় পড়িয়ে দিলাম। এই লকেটটা বাবার ছিলো। বাবা এটা পকেটে রাখতেন। এটার মধ্যে প্রটেকশন স্পেল পড়ে দেয়া আছে। এটার মধ্যে যে সাইন আছে সেটাকে বলে ‘দ্যা আই অফ হোরাস’। গ্রীকদের মতে, হোরাস হচ্ছে প্রটেকশন বা সমস্যা থেকে মুক্তির ঈশ্বর। আমি মন্ত্র পড়ে তিন্নির রুম বন্ধ করে দিলাম। 

এবার বাইরে এসে এক বালতি পানি গরম করলাম। কাপড়চোপড় খুলে পানির মাঝে পা ডুবিয়ে বসলাম। তিন্নির কাপড় পানিতে ডুবিয়ে রাখলাম। আমার নোটবুক বের করলাম। মন্ত্র পড়া শুরু করলাম। সাদা দেয়ালগুলো আবার কালো হতে শুরু করেছে। ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে আবার। সেই চিৎকার, কান্নার আওয়াজ আমি আবার শুনতে পাচ্ছি। বালতির পানি ফুটতে শুরু করেছে। তিন্নির কাপড় পুড়ে যাচ্ছে। আমার মাথা ঘোরাচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে, প্যান্ট পড়তেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।

তিন্নি – আপনি ঠিক আছেন? আপনার শরীরের কাপড় নেই কেনো? আপনি এখানে কীভাবে আসলেন? 
আমি (উঠতে উঠতে) – একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করলে জবাব দেবো কোনটার?
তিন্নি মুচকি হেসে সরে গেলো। আমাকে ধরে তুললো। তিন্নিকে আবার আগের মতো সুন্দরী মনে হচ্ছে। জানলা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে। তিন্নিকে সেই সূর্যের আলোয় পরীর মতো মনে হচ্ছে। তিন্নির চোখের নিচে কালো দাগ আর দেখা যাচ্ছে না। 
আমি শার্ট পড়তে পড়তে তিন্নিকে বললাম – আপনার শরীর ঠিক আছে?
তিন্নি – জ্বী। আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু বাবা কোথায়?
আমি – আজকে বরঞ্চ আমি আসি! আপনি ধীরে ধীরে সবকিছু জানতে পারবেন। আপনার ‘নীল’ আপনাকে সবকিছুই খুলে বলবে। আর আপনার বাসায় এখন আর কোনো সমস্যা নেই। আরেকটা কথা, দুতলা আর বন্ধ রাখবেন না। আর বাসায় একা থাকবেন না। আপাতত কিছুদিন কোনো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসুন। 
তিন্নি – আমার কোনো বন্ধু নেই। আপনাকে ফোন দিলে আপনি আসবেন? 
আমি হেসে চলে আসলাম। রাস্তায় এসে দেখি আমার আবার মাথা ঘোরাচ্ছে। কাউকে নিজের আয়ু দান করে আসলে এই অবস্থাই হয়। হোটেলের চাবি তিন্নিদের ঘরেই ফেলে এসেছি। এখন আবার ফেরত যেতেও ইচ্ছে করছে না। সাফার সাথে দেখা করে আসা যায়। আর শরীরের অবস্থাও বেশ ভালো না।

দরজা খুলতেই সাফা চিৎকার দিয়ে আমাকে গালাগাল শুরু করে দিলো, “তোর কি মনে হয় আমি জানি না যে তুই দেশে এসেছিস? আমার কোনো চোখ নেই? আমি খবর রাখি না তোর? আর দেশে এসেই বাবার মতো শুরু করে দিয়েছিস? বাবা এসব করতে করতেই মারা গেলেন আর তুইও এখন এসব করতে করতেই মারা যাবি। তোদের যন্ত্রণায় আমরা মা আর মেয়ে কোনোদিনও শান্তি পাই নি। তোরা শান্তি দিবিও না”। 

সাফা আর থামবে না আজকে। সে আপেলের জুস আনতে রান্নাঘরে ঢুকেছে। সেখান থেকেও চিৎকার চেঁচামেচি করছে। মধ্যের রুমে দুলাভাই ঘুমাচ্ছে। আমি সাফাকে চিৎকার করে বললাম, “তোর জামাই এখনো ঘুমায়”? এবার সাফা শুরু করবে দুলাভাইকে বকাবকি! আমি গিয়ে বেডরুমে শুতেই ঘুম চলে আসলো। আমি শান্তিতে ঘুমোতে পারবো কিছুক্ষণ। বিছানাই শুতেই ঘুম চলে এসেছে। চোখের সামনে উজ্জ্বল শ্যামলার একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি মনে হয় স্বপ্নে দেখছি। হ্যা স্বপ্নই দেখছি।
ঘুম থেকে উঠলাম প্রায় ১৫ ঘন্টা পর। সাফা না খেয়ে বসে আছে। দুলাভাইকেও খেতে দেয় নি। আমি গোসল করে টেবিলে আসলাম। 
আমি – কি খবর দুলাভাই?
দুলাভাই (সাফার স্বামী) – এইতো চলে। তোমার কি খবর? তো হঠাত?
আমি – এই দেশে কিছু কাজ ছিলো। তিন চারদিন পরেই চলে যাবো। 
ঘুমানোর আগে সাফা আমার রুমে আসলো। তাকে এখন সবকিছু খুলে বলতে হবে। কি আর করা। সবকিছু বলতে শুরু করলাম। 
আমি – …তারপরে? তিন্নির বাবা হাত বেঁধে রাখায় আমি মুখ দিয়েই মন্ত্র পড়তে পারলাম। হাতের বাধন খুলতেই পকেট থেকে লাইটার বের করে তাকে দোযখে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। এইতো। আশফাক সাহেব না জেনে আমাকে সেই ডেমনের নাম বলে দিয়েছে যেটা তার উপর পোসেস করে আছে। সেটার নাম হচ্ছে ‘নিরন’। তুই তো জানিসই, ডেমনকে কোনো হোস্টের উপর পোসেসড না করিয়ে একাকী ধ্বংস করা যায় না। আর এই ক্ষেত্রে তিন্নির বাবাই হোস্ট ছিলেন। যার ফলে একেবারে সহজেই তাকেসহ ডেমনটাকে দোযখে পাঠানো গেলো। আমি ভেবেছিলাম তিন্নির সাথে যে ডেমন আছে সেটা সমস্যা করবে। কিন্তু না তিন্নির সাথে কেউই নেই। তিন্নিকে আশফাক সাহেবের এই ডেমনই ভিন্ন ভিন্ন রুপে আমাকে ডাকতে বলেছে। নিরন অনেকদিন ধরেই এই প্ল্যান করছিলো। কারণ, নিরন মুলত একটা স্পিরিট ছাড়া আর কিছুই নয়। ডেমনের মতো ক্ষমতাও নেই এর। কিন্তু এর সাথে আমার সমস্যা হচ্ছে, বাবাই স্পিরিটটাকে প্রথমবার ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাবা মারা যান। যার ফলে এটা প্রতিশোধের আগুনেই জ্বলছিলো এতদিন। 
সাফা – কিন্তু তুই মেয়েটাকে আবার বাঁচালি কীভাবে? মেয়েটা চার বছর ধরে পোসেসড হয়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন ডেমনের দ্বারা। তাহলে তুই কি করে মেয়েটাকে সুস্থ করলি?
আমি (সিগারেট ধরাতে ধরাতে) – আমি বেশি কিছু করি নি। আমার আয়ু থেকে কিছু আয়ু আমি দান করে দিলাম মেয়েটাকে। মেয়েটার কাছে তাই মনে হবে যে, তার আবার পুনর্জন্ম হয়েছে। 
সাফা আবার বকতে শুরু করলো। বকতে বকতে ঘুমোতে গেলো।

তিন্নি – আপনাকে আমি গত পরশুদিন দেখেছি!
আমি – কোথায় দেখেছেন?
তিন্নি – আপনি সিগারেট টানতে টানতে হাটছিলেন। আমার বাসার সামনে দিয়ে গেলেন।
আমি – আপনার বাসা কোথায়?
তিন্নি – মির্জাজাঙ্গালের ওদিকে।
আমি – আচ্ছা। হ্যা। আমার বন্ধু ওদিকে থাকে। তার বাসা ওদিকে। সেদিক থেকেই আসছিলাম।
তিন্নি – ওহ আচ্ছা আচ্ছা। কালকে আবার আসবেন?
আমি – আসতে পারি। সিউর না। 
তিন্নি – কখন আসবেন?
আমি – সেটাও জানি না। আপনার কোনো দরকার? আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে?
তিন্নি – কী? নাহ তো! আমি কখন বললাম? আর আপনি এত বেশি বুঝেন কেনো? আপনার ছেলেরা মেয়েদের ভাবেনটা কি? 
আমি – এখনো কিছু ভাবি নি তো! যাই হোক, দেখতে না চাইলে নাই! আমি যাই, কাজ আছে আমার। 
মনে মনে ভাবছি, আর তোমার সাথে আমার দেখা হবে না। কারণ, আমি কাল চলে যাচ্ছি, অস্ট্রেলিয়াতে! হয়তো আবার কখনো ফিরে আসবো। দেখা হওয়ার ইচ্ছাটা আপেক্ষিক হয়ে রইলো!

One Comment

Leave a Reply
  1. It is appropriate time to make some plans for the future and
    it’s time to be happy. I’ve read this post and if I could
    I wish to suggest you few interesting things or
    tips. Maybe you could write next articles referring to this article.
    I want to read more things about it! Amazing!
    This blog looks just like my old one! It’s on a totally different subject but it has
    pretty much the same page layout and design. Great choice of colors!

    Hello, i read your blog occasionally and i own a similar one and i was just wondering if you get a lot of spam comments?

    If so how do you stop it, any plugin or anything you can suggest?
    I get so much lately it’s driving me insane so any support is very much appreciated.
    http://samsung.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কীভাবে একজন ফ্যাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন

আইকিউ টেস্ট | মেনসা টেস্ট