in

পরী

রাত দুটো বেজে পঞ্চাশ মিনিট। সেকেন্ডের কাটা খুব তাড়াতাড়িই ঘুরছে বলে মনে হচ্ছে। আয়ানের হাত-পা কাঁপছে। হৃদস্পন্দন আরো বাড়ছে। কাল সকালে সে একটা মেয়ের সাথে দেখা করতে যাবে। প্রথম সাক্ষাৎ। যদিও সে এর আগে আরো অনেক মেয়ের সাথেই প্রথম সাক্ষাতে গিয়েছে, তারপরে সেটা দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়েছে, তারপর তৃতীয়। এভাবে হয়তো বেশ কয়েকশ’ সাক্ষাৎ হওয়ার পরেও কোনো সম্পর্কই টিকে থাকে নি তার। কিন্তু কাল যে মেয়ের সাথে সে দেখা করতে যাবে, সে জানে যে এই মেয়ের সাথে তার সম্পর্ক টিকে থাকবে। কারণ, সে জানে!

আয়ান কীভাবে জানে? আয়ান নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ বলতে পারে না তাই না? আয়ান ভবিষ্যৎ বলতে পারে না এটা ঠিকই। কিন্তু আয়ানের এক বন্ধু, শাফিন; সে প্রিকগনিটিভ ক্ষমতার অধিকারী। অর্থাৎ সে স্বপ্নে কিংবা জাগ্রত অবস্থায় ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পারে।

আয়ানের সাথে শাফিনের সম্পর্ক অনেকদিনের। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় আর তারপরে সেখানেই দুই বন্ধু মিলে ঠিক করলো বাংলাদেশের সুপারন্যাচারাল সব মানুষদের খুঁজে বের করবে। শাফিনের ক্ষমতা ছিলো, প্রিকগনিশন। সে শুরুতে স্বপ্নের মাধ্যমে কিছুটা ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পারতো। এই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখিয়েছে আয়ান। আয়ান ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান। সে স্যাটানিস্ট।

শুরুতে ধর্ম নিয়ে যদিও শাফিন আর আয়ানের মাঝে বিরাট ঝামেলা তৈরি হয়েছিলো কিন্তু শেষমেষ এটা ঠিক হয়ে যায়। শাফিন নিজের ভুল বুঝতে পারে। সে স্বীকার করে নেয় যে, যার যেটা ইচ্ছা সেই ধর্মই তাকে পালন করতে দেয়া উচিত। শাফিন গোঁড়া ধার্মিক পরিবার থেকে উঠে এসেছে আর তাই আয়ান তাকে বারবার বুঝিয়েছে, বারবার। যদিও আয়ানের পরিবার গোঁড়া ধার্মিক নয় কিন্তু তারপরেও আয়ানের মা কট্টর ইসলামিক মাইন্ডেড মহিলা। আয়ানের পরিবারের কেউ জানে না যে সে স্যাটানিস্ট, ডেভিল ওয়ারশিপার কিংবা শয়তানের উপাসক।

৪২০০ ধর্মের মাঝে প্রায় দুশয়ের বেশি ধর্ম সম্পর্কে আয়ানের অসাধারণ জ্ঞান রয়েছে। সুপারন্যাচারাল ক্ষমতা, প্যারাসাইকোলজিক্যাল এনটিটি ও প্যারানরমাল একটিভিটিসের উপর আয়ান যথেষ্ট দক্ষ। একজন ধর্মের স্কলারের সাথে পুরোদমে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা রাখে সে। সাতটার বেশি ভাষায় কথা বলতে পারে আয়ান – তার মাঝে, হায়রোগ্লিফিক্স, কপ্টিক, অ্যারামায়িক ইত্যাদি প্রাচীন ভাষাও রয়েছে। প্রায় তিন হাজারের উপর স্পেল বা মন্ত্র তার সংগ্রহে রয়েছে। নিজের ডায়েরীতে সেসব লিখে রাখে সে। আর সেই ডায়েরী তার পকেটে থাকে প্রায় সবসময়ই।

যদিও সাইকোলজি আর প্যারাসাইকোলজিতে আয়ানের আগ্রহ দেখে যে কেউ মনে করতে পারে যে, তার মূল কাজ কিংবা তার পড়ালেখা হয়তো এসব নিয়েই। কিন্তু আসলে আয়ানের শখগুলো অনেকটা উদ্ভট – যেমনঃ ইতিহাসের বই পড়া, লুসিড ড্রিমিং, সাইকোলজিক্যাল রিসার্চ ইত্যাদি। আয়ান মূলত কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছে। নিজের একটি টেক কোম্পানি তৈরি করার ইচ্ছা আছে আয়ানের। উদ্যোক্তা হিসেবেই নিজেকে দেখতে চায় আয়ান।

কোনোরকমে সকালের আলো ফুটেছে। বাইরের দিকে তাকিয়েই সে একটা হাসি দিলো। সূর্যের আলো পানির ফোঁটার মতো তার গাল বেয়ে পড়ছে আর সে ভাবছে। 
মেয়েটার সাথে সকাল ১১ টায় দেখা করার কথা। মেয়েটার সাথে পরিচয় ফেসবুকেই। মেয়েটাকে যখন প্রথম সে দেখেছে, তখনই মেয়েটার প্রেমে পড়ে যায় আয়ান। মেয়েটার গোল গোল চোখ সবার আগে তার ঠোঁটে হাসি ফুটিয়েছে। 
চোখের দিকে তাকানোর পরে সে এক ধরণের মায়া অনুভব করেছে। এত সুন্দর চোখের রূপবতী মেয়েটার সাথে তার আজকে দেখা হবে এটা ভেবেই সে শিহরিত। মেয়েটার গোলাপি ঠোঁটের কোনে হালকা একটা হাসি ছিলো। সেই হাসি দেখার পরে আয়ান আর ঠিক থাকতে পারলো না! টেক্সট দিয়েই বসলো! 
– চিনতে চাই!
– দুঃখিত, আমার মন খারাপ। আমি কথা বলতে চাচ্ছি না এখন!
– উম্মম্মম্ম… আচ্ছা! ভালো থাকবেন!
এর ঠিক তিন দিন পরেই আয়ান ফেসবুকে ঢুকেই একটা মেসেজ দেখে, ঐ মেয়ের।
– আপনি কি জানি বলতে চেয়েছিলেন? 
– ভালো আছেন? 
– জ্বি! আপনি? 
– ভালো! মন ঠিক আছে এখন? 
– জ্বি, ঠিক আছে। 
মেয়েটার সাথে কথা বলতে বলতেই আয়ান ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্নে সেদিন মেয়েটাকেই দেখে। ঘুম ভেঙে দেখে, আয়ানের মা আয়ানের পাশে বসে আছে!
– ঘুমের মধ্যে হাসছিলি কেনো তুই? 
– এমনিই মা! (মুচকি হেসে)
তারপর প্রত্যেক মুহূর্তের খুনসুটির পর, হাজার রঙের কথা বার্তার পর আর অনেকগুলো হাসির পর আয়ান মেয়েটাকে মনের কথা জানিয়ে বসে! 
– পরী, আমি তোমাকে ভালোবাসি! 
– আমার মাত্রই ব্রেকআপ হয়েছে। তিন বছরের সম্পর্ক! এখনই অন্য আরেকটা সম্পর্কে যাওয়ার মতো অবস্থা আমার নেই! আমাকে ভাবতে দাও!
– আচ্ছা, ভাবো। যত সময় নেয়ার ইচ্ছে হয়, নাও! তারপরেও উত্তর দিও।

পরীর সাথে আয়ানের প্রথম সাক্ষাৎ হয় বাসে। মেয়েটা বাড়িতে যাচ্ছিলো। সে আয়ানকে বলে, তাকে যেনো বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয় সে। আয়ান দু ঘন্টার সেই জার্নি কোনোদিন ভুলতে পারবে না। বাসে আয়ান আর পরী, পাশাপাশি বসে। আয়ান অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। সেই জার্নিতে তারা অনেক কিছু নিয়ে কথা বলে, মেয়েটাই প্রথম আয়ানের হাত ধরে। আয়ান সেই হাত কোনোদিন ছাড়তে চায় না।

আয়ান যখন মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরছে, তখন সে প্রায় কেঁদেই দিয়েছে। সে ভেবেছে আর কোনোদিনও মেয়েটার সাথে তার কথা হবে না, দেখা হবে না, আর কোনোদিনও এই নারীকে তার পাওয়া হবে না। বাসায় ফিরে সে কিছুতেই এই নারীর কথা আর মাথা থেকে সরাতে পারে না। কিছুতেই না। বারবার চেষ্টা করেছে, হাজার বার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই মেয়ের অনুভূতি সে আর পরিবর্তন করতে পারছে না।

আয়ানের অনেকগুলো সম্পর্ক ছিলো। গুনে বলা যাবে না আসলে। তারপরেও তার যা কিছু মনে আছে, সে হিসেবে প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি তো হবেই। তার মাঝে প্রায় বেশিরভাগ মেয়ের সাথেই তার বিছানায় যাওয়া হয়েছে। সে প্রায়ই বলতো, “সাইকোলজি আর সৌন্দর্য যখন একত্র হয়, তখন সেটা মানুষকে বারবার খুন করতে পারে আর সেই খুনকেই বলে জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা”।


পরীর সাথে আয়ানের সম্পর্কের প্রায় তিন বছর হতে চললো। আয়ান পরীকে সেই আগের মতোই ভালোবাসে। আসলে আগের মতো বললে ভুল হবে, আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। অনেক বেশি ভালোবাসে। পরীর সাথে তার এই তিন বছরে প্রায় শ’য়ের কাছাকাছিবার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। অন্য মেয়েদের সাথে শারীরিক সম্পর্কের পরে আয়ান যেভাবে তাদের ভুলে গিয়েছে, সেভাবে সে এই মেয়েটাকে ভুলতে পারছে না। সে যে ভোলার চেষ্টা করে নি, তা কিন্তু না। সে প্রথম এক বছরে অনেকবার চেষ্টা করেছে, পরীকে ভুলে যেতে। কিন্তু সে যতবারই ভেবেছে পরীকে ভুলে যাবে ততবারই সে বাতাসে পরীর ঘ্রাণ পেয়েছে। এখনো পায়।

মেয়েদের শরীরের এক ধরণের ঘ্রাণ থাকে, ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই প্রত্যেক মেয়ের শরীরের ঘ্রাণ আলাদা। মায়ের শরীরের ঘ্রাণ এক রকম আবার স্ত্রীর শরীরের ঘ্রাণ অন্যরকম। একইভাবে প্রত্যেক ছেলের শরীরেও তাদের নিজস্ব ঘ্রাণ রয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, মেয়েদের বা ছেলেদের শরীরের ঘ্রাণ তারা নিজেরা পায় না। একটা মেয়েই বা ছেলেই কেবল আরেকটা ছেলের বা মেয়ের শরীরের ঘ্রাণ পায়। এই ঘ্রাণ দিয়েই আপনি আপনার প্রিয় মানুষদের আলাদা করতে পারবেন।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে আয়ান আর পরীর মাঝে সম্পর্ক চলছে। পরী শুরুতেই জানতো যে আয়ান ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান, আয়ান মুসলমান নয়। কিন্তু তারপরেও সে মেনে নিয়েছে, সম্পর্ক করেছে। কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকেই পরী বারবার আয়ানকে এসব জাদুবিদ্যা ছেড়ে দেয়ার জন্যে জোর করতে শুরু করে, প্রত্যেক ধাপে ধাপেই খোঁটা দিতে শুরু করে।

পরীর একবার জ্বর হয়েছিলো। একশ চার ছাড়িয়ে যায় জ্বরে। পরী উল্টোপাল্টা বকতে শুরু করে। সেদিন রাতে পরীর বাসার সামনে সকাল পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলো আয়ান, শুধুমাত্র একবার পরীকে দেখার জন্য। পরীর এই অবস্থায় আয়ান বারবার তাকে দেখতে চেয়েছে। শেষমেষ অনেক কিছু করে পরীর বাসায় চলে গিয়েছে আয়ান। অনেক ঘটনা ঘটিয়ে দেখে এসেছে।

ডাক্তারকে বলতে শুনেছে যে, পরীর জ্বর আরো বাড়বে। সাধারণত ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রি জ্বরে মানুষ মারা যায় না, কিন্তু ১০৮ ডিগ্রি কিংবা এর বেশ হয়ে গেলে জ্বরের কারণেই মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আর আয়ান যেটা ভয় পেয়েছিলো, সেটাই হয়েছে। জ্বর কালকে রাতের মধ্যেই ১০৬ ডিগ্রির উপরে উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আয়ান এখন চোখে অন্ধকার দেখছে। সে জানে না সে কি করতে চলেছে। হঠাত আয়ান তার জীবনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হাতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। আয়ান ঠিক করলো সবচেয়ে কঠিন যে মন্ত্র সে জানে, সেটার মাধ্যমে সে পরীকে সারিয়ে তুলবে। কিন্তু এর জন্যে যে আয়ানকেও মারা যেতে হতে পারে, এটাও সে জানতো!

আয়ান কোনোদিন ব্ল্যাক ম্যাজিকে রক্তের ব্যবহার করে নি। আসলেই ব্ল্যাক ম্যাজিকের বিশেষ কিছু মন্ত্র ও উদ্দেশ্য ছাড়া রক্তের ব্যবহার করতে হয় না। সে যখন ব্ল্যাক ম্যাজিক শিখছিলো, এসব নিয়ে গবেষণা করছিলো; তখন এক রাতে, প্রায় না জেনেই সে কিছু শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেছিলো। সেগুলো ছিলো এনোখিয়ান ভাষায় লেখা। এনোখিয়ান ভাষাকে মূলত স্যাটানিস্টদের ভাষা বলে আখ্যায়িত করা যায়। স্যাটানিজমে সবচেয়ে বেশি মন্ত্র এনোখিয়ান আর আরমায়িক ভাষায় লেখা হয়েছে। আরো অনেক ভাষাতেই মন্ত্র লেখা হয়, যেমন – সংস্কৃত, হিব্রু, ইড্ডিশ, ল্যাটিন ইত্যাদি।

৬ বছর আগের সেই রাতে আয়ান ঘুমাতে পারছিলো না। কিছুক্ষণ পরে পরেই কানের কাছে এসে কে যেনো ফিসফিস করতে শুরু করে আয়ানের। প্রথম কয়েকবার মশা ভেবে তাড়িয়ে দিলেও পরে চোখ খুলে দেখে, কে যেনো তার বিছানার পাশের সোফায় বসে আছে। আয়ান এর আগে অনেকবার ডেমন বা জ্বিন দেখেছে তবে কোনোবারই সে ভয় পায় নি। কিন্তু এইবার তার শরীর কাঁপিয়ে জ্বর চলে আসলো। রাতে সে বেশ কয়েকবার বমিও করেছিলো।

তারপরে একসময় সে বুঝতে পারলো সেই ফিসফিসের আসল কারণ, কে, কিসের জন্যে ফিসফিস করছিলো। সে অনেক কষ্টে বিছানা থেকে উঠে তার প্যান্টের পকেট থেকে সেই নোটবুক বের করে সেই শব্দগুলোর মানে খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু যখন সে সেই শব্দগুলোর মানে খুঁজে পায় ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। সে কোনোরকমে দৌড়ে তার রুমে গেলো, মোমবাতি জালিয়ে উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়তে শুরু করলো।

তারপরে সে টেলিপ্যাথিক্যালি শুনতে পাচ্ছিলো সবকিছুই, স্বয়ং শয়তান তার সাথে কথা বলছে। সে ধ্যান থেকে উঠার আগেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলো। জ্ঞান ফেরার পরে গোসলের সময় সে দেখতে পায় যে, তার পিঠের নিচের দিকে ‘লুসিফারিয়ান সিল’। অর্থাৎ, সে যেটা ভেবেছিলো সেটা হয়ে গিয়েছে। যেটাকে সে ব্ল্যাক ম্যাজিক শেখার শুরু থেকেই ইগনোর করে আসছিলো, এখন সেটাই হয়ে গেলো। 

লুসিফারিয়ান সিলকে স্যাটানিজমে ‘দ্যা সিল অফ বন্ডিং’ হিসেবে ধারণা করা হয়। এই সিল যার শরীরের সঠিক নিয়মে এঁকে দেয়া হবে আর একইসাথে বন্ডিং স্পেল পড়া হবে, তার আত্মা স্বয়ং শয়তানের কাছে চলে যাবে। যেটাকে অন্য ভাষায় বলে, শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি।

আয়ান সেদিনের পর থেকেই কার্সড। ব্ল্যাক ম্যাজিকের মাস্টার লেভেলে সে পৌঁছাতে পারতো না, যদি না সে এই বন্ডিং পূরণ করতে পারতো। ব্ল্যাক ম্যাজিকের কিছু শর্তের মাঝে দুটো মূল শর্ত হচ্ছে, একজন ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান কখনোই তার নিজের জন্যে কিছু করতে পারবে না, যদি সেটা করা হয় তাহলে তার মৃত্যু স্বাভাবিক হবে না। স্বয়ং শয়তান পৃথিবীতে নেমে আসবে শুধু তাকে দুনিয়া থেকে নরকে টেনে নেয়ার জন্য। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিলো, যদি কেউ নিজের আত্মা শয়তানের কাছে দিয়ে দেয় আর তারপরে সে যদি কোনোভাবে পৃথিবীর যেকোনো মেয়ের উপর দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে শয়তান তার আত্মা ফিরিয়ে দেবে। 

এসব ভাবতে ভাবতে আয়ান বাসায় আসলো। নিজের জামা কাপড় খুলে পানি গরম করে নিয়ে আসলো। আলমারি থেকে পরীর একটা কাপড় এনে পানিতে ফেলে, উচ্চস্বরে বলে উঠলো, ‘অ্যামায়ো স্যাটানাস, শাহারি স্যাটিয়োশা বোলাপে মায়েল পেরেখি’, আর সাথে সাথেই পানির মধ্যেই পরীর কাপড়ে আগুন ধরে গেলো। সে বালতির পানিতে পা ডুবিয়ে, পাশের টেবিল থেকে ব্লেড হাতে নিলো। বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের নিচে অনেকটা অংশ কেটে ফেললো। রক্ত ফিনকি দিয়ে ছুটছে। রক্তের ফোটা পানিতে পড়ছে। ব্লেড ফেলে দিয়ে সে মন্ত্র পড়তে শুরু করলো। আয়ানের হৃদস্পন্দ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলো। আশেপাশে বকুলফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছে সে। চোখের সামনে অন্ধকার দেখছে। মাথা ঘুরে চেয়ার থেকে পড়ে গেলো আয়ান।

হেলিকপ্টারের শব্দে আয়ান চোখ খুললো। এত আলো কেনো? নরক দেখতে এমন হবে সেটা তার জানা ছিলো না। অনেকটা আয়ানের নিজের রুমের মতোই। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে পরী বসে আছে। পরীও কি আয়ানের সাথে নরকে চলে আসলো? কিন্তু কেনো? পরীর তো নরকে যাওয়ার কথা না? পরীর তো বেঁচে থাকার কথা! অনেকদিন! তাহলে?
– আমরা নরকে?
– নরক? নরক কোথায় পেলে? কি করেছো তুমি? 
– আমি কিছুই করি নি। শুধু তোমার জ্বর সারানোর চেষ্টা করেছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই!
– কেনো করতে গেলে এসব? তুমিই বারবার বলতে নিজের জন্য কিছু করবে না আর তুমি আমাকে কথাও দিয়েছিলে যে তুমি আমার উপর কখনোই কোনো স্পেল করবে না। তুমি জানতে যে, এটা করলে তুমি মারা যাবে। তাহলে কেনো করলে? কেনো?
– আমি বেঁচে আছি এখনো? 
– গত বারদিন ধরে তুমি ঘুমিয়ে ছিলে। শরীর থেকে অনেক রক্ত গিয়েছে তোমার। তারপরে কোনোরকমে বেঁচে গিয়েছো। 
পরীর চোখ থেকে পানি পড়ছে। এত আলোর মাঝে পরীর চোখের পানি হীরের টুকরোর মতো জ্বলছে। আয়ান চোখ বন্ধ করে ফেললো। সে ভাবছে হেলিকপ্টার নিয়ে। ঘুমন্ত অবস্থায় হেলিকপ্টারের শব্দ কেনো শুনছিলো সে? তারপরে বুঝতে পারলো যে, ফ্যানের শব্দই তার কাছে স্বপ্নে হেলিকপ্টারের আকার ধারণ করে এসেছিলো। এই হচ্ছে স্বপ্নের সমস্যা। ঘুমন্ত অবস্থায় যদি ছোটো একটা পিঁপড়া আপনাকে কামড়ায় তাহলে ঘুমের ভেতর সেটাকে আমরা বিশাল বড় কোনো প্রাণীর আকারে দেখি।

পরীর জন্য সেই স্পেল ব্যবহার করার পর থেকেই সে আয়ানকে বারবার এটা নিয়ে খোঁটা দিতে শুরু করে। আয়ান তাকে বারবার বুঝিয়েছে যে, এই স্পেল ব্যবহার করার কারণেই পরী আজকে বেঁচে উঠতে পেরেছে। কিন্তু তারপরেও সে আয়ানকেই এটার জন্য দোষ দেয়। সবকিছুতেই আয়ানের দোষ!

তিন বছরের এই সম্পর্কে আয়ান একটা জিনিস ভালোমতোই শিখেছে, ফেমিনিন সাইকোলজিতে, অর্থাৎ সাইকোলজির যে ভাগে শুধুমাত্র নারীদের মনস্তাত্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় সেই অংশকেই বলে ফেমিনিন সাইকোলজি; তো, ফেমিনিন সাইকোলজিতে, পুরুষের রাগ অতিমাত্রায় উঠে গেলে তা গালাগালের দিকে রূপ নিতে পারে কিংবা হাতাহাতির দিকে রুপ নেবে। বেশিরভাগ পুরূষের ধৈর্যই নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। নারীদের সহ্যক্ষমতা অসাধারণ। 

কিন্তু ধৈর্যক্ষমতা খুবই অল্প। আর নারীদের রাগ বাড়তে থাকলে একসময় তা ইমোশনালি উইকনেস তৈরি করে। তারা গালাগাল কিংবা হাতাহাতি করতে চায় না বা পারে না। আর সেটার জন্যেই তারা ইমোশনালি আপনার থেকে দূরে চলে যেতে চাইবে। আর এই ভয়টাই পাচ্ছিলো আয়ান। পরীকে সে বারবার বুঝিয়ে তার কাছে রাখতে চেয়েছে, কিন্তু পরীর রাগ ধীরে ধীরে বাড়ছিলো। আয়ান জানে, যে যদি চায় তাহলে পরীকে ধরে রাখা তার কাছে কিছুই না। একটা মন্ত্র পড়লেই পরী তার। কিন্তু এখন সে যেই পরীকে চেনে, সেই পরীই কি তার থাকবে?

আয়ানের ঘুম আসছে না। তার পাশেই শুয়ে আছে নায়লা। মেয়েটা দেখতে অনেকটাই পরীর মতো। কিন্তু পরী নায়লার মতো নয়! তার পরী সবসময়েই একজন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একজন সার্ভে রিসার্চার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার উপায়