Source: http://www.jetsetmag.com
in ,

ফোবিয়া কি? এর কারণ ও আদি-অন্ত

‘ফোবিয়া’ হচ্ছে এক ধরণের মানসিক সমস্যা। ফোবিয়া মূলত এক ধরণের অযৌক্তিক ভয় যেটার পরিমাণ সাধারন ভয় থেকে কয়েক গুণ বেশি হয়ে থাকে। ফোবিয়া শব্দটি গ্রীক শব্দ ‘ফোবোস’ থেকে এসেছে, যার মানে হচ্ছে ভয় বা হরর।

যখন কারো ফোবিয়া থাকে তখন সেই ব্যক্তি সেই ঘটনা বা সিচুয়েশন বা বস্তুর উপর মারাত্মক ভয় অনুভব করে। সাধারণ ভয় থেকে ফোবিয়ার পার্থক্য হচ্ছে, ফোবিয়া মূলত মানসিক সমস্যা হিসেবে রুপ নেয়। ফোবিয়ার কারণে দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, হাই ব্লাড প্রেসার থেকে শুরু করে স্ট্রোকের মাধ্যমে মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে। যারা ফোবিয়ায় আক্রান্ত তারা সেই ভয়ের পয়েন্ট থেকে কোনো চিন্তা না করেই সরাসরি এভয়েড করে চলে।

ফোবিয়া মূলত এক ধরনের উদ্বেগজনিত রোগ। যদিও এটা বেশ কমন একটা রোগ। শুধুমাত্র আমেরিকার তরুণদের ৩০ শতাংশের বেশিই উদ্বেগজনিত রোগে ভুগছেন। যদিও বেশিরভাগ ফোবিয়াই ছোটো থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে কিন্তু বড় হওয়ার পরেও এটার উন্নতি হতে পারে। যার ফোবিয়া রয়েছে, সেও কিন্তু জানে যে, তার এই ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক আর অযৌক্তিক। কিন্তু তারপরেও সে ভয় পেয়ে চলে। এটাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

মাঝখানে একটা কথা বলে নিই। বর্তমানে দেখে থাকবেন যে, নিজেকে একজন ফোবিক (যার ফোবিয়া রয়েছে তাকে ফোবিক বলা হয়) হিসেবে প্রকাশ করাটা এক ধরনের সস্তা মানসিকতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, নিজেকে অসুস্থ হিসেবে দেখিয়ে সেন্টিমেন্ট আদায় করে নেয়া। যে খারাপ কাজ করতে পছন্দ করে, সে কিন্তু নিজের অজান্তেই একজন সাইকোপ্যাথের প্রথম স্টেপ স্বীকার করে নিয়েছে। নিজের রোগকে কাজে লাগিয়ে অন্যের দয়া বা সেন্টিমেন্ট আদায় করে নেয়াটাও এরকমই একটা বিষয়।

বর্তমানে কিছু হলেই সে নিজেকে একজন ফোবিক হিসেবে দাবি করতে শুরু করে। কিন্তু আসলেই কি একজন ফোবিক হওয়াটা এতটা সহজ? একজন ফোবিক মূলত যেকোনো বিষয় নিয়ে প্রচন্ড ভয়ে থাকে। যেখানে একজন সাধারণ ভয় পাওয়া মানুষ ততটা ভয় পায় না। চলুন তাহলে আরেকটু গভীর থেকে জেনে নিই, আসলেই ফোবিয়া আক্রান্ত মানুষের ভয় আর সাধারন ভয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায় আর কতটুকু!

সাধারণ ভয় vs ফোবিয়া

  • ধরুন, বিমানে চড়ার সময়, বিমানে ওঠার পর কিংবা বিমান টেক অফের সময় ভয় পেতে পারেন কিন্তু ফোবিয়ায় আক্রান্ত রোগী তার নিজের ভাইয়ের বিয়েতে পর্যন্ত যাবে না, শুধুমাত্র পেলে চড়তে হবে দেখে। ভয়ের মাত্রাটা বোঝার চেষ্টা করুন।
  • সিড়ি দিয়ে চড়ে কোনোরকমে দেয়াল ঘেঁষে ব্রিজ ক্রস করে ফেলবে। কারণ সে উপর থেকে নিচের দিকে থাকাতে ভয় পায়, অন্যদিকে ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি পুরো রাস্তা ঘুরে কিংবা ১/২ মাইল ঘুরে তারপরে অন্য দিকে যাবে কিন্তু তারপরেও সিড়িতে চড়ে ব্রিজ ক্রস করবে না।
  • কুকুরকে ভয় পায়, তাই কুকুরের সামনে গেলে তার সাথে কমিউনিকেশন করার চেষ্টা করবে, অন্যদিকে ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি কুকুরকে ভয় পায় বলে, নিজের বাড়ির সামনে প্রায় ১০ বারো ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ভেতরে একটা কুকুর ঢুকেছে, যেটা এখনো বেরোয় নি!
  • গুলি লাগলে, কোনো রকমে সহ্য করে সেলাই দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে ফোবিয়াগ্রস্থ ব্যক্তি গুলি লাগার পরেও সেলাই দেয়ার ভয়ে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট নিচ্ছে না।

এবার বুঝেছেন? ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি, সেই ফোবিয়ার সাথে যুক্ত সকল অবস্থায় সম্পর্কে মারাত্মক ভীত থাকে। একজন সাধারণ ভীত ব্যক্তি যেটা অনেক কষ্ট করে হলেও করে ফেলবে সেখানে ফোবিয়াগ্রস্থ ব্যক্তি সেটা করতে চাইবে না, কোনোভাবেই না।

সাধারণ ভয় কত ধরণের হয়?

আমরা ছোটো থেকেই ভয় পেয়ে আসছি। যেমন, প্রায় প্রত্যেকেই একটা বয়সে অন্ধকারকে ভয় পেয়েছি। এক সময় সেটা দূর হয়ে গিয়েছে। যাদের এখনো অন্ধকারকে ভয় করে, তারা হয়তো এমন কোনো জিনিসে ভয় পান না, যেটা বাকি মানুষেরা ভয় পাবো। একটা ভয়ের লিস্ট করা যাক, কেমন?

০-২ বছরের শিশু – উচ্চশব্দ, অপরিচিত ব্যক্তি, বাবা-মা থেকে আলাদা, বড় বস্তু বা প্রাণী দেখলে ভয় পায়।

৩-৬ বছরের ছেলে/মেয়ে – ভূত, মন্সটার, অন্ধকার, একা ঘুমাতে যাওয়া, উদ্ভট শব্দ ইত্যাদি ভয় পেয়ে থাকে।

৭-১৬ বছরের তরুণ/তরুণীরা – আঘাত পাওয়া, অসুস্থতা, মানুষের সামনে কথা বলা, কোনো ধরণের অনুষ্ঠান, মৃত্যু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদিতে ভয় পায়।

এই ধরণের ভয় গুলো সাধারন। ১৬ বছরের বেশি বয়সের ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে ভয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্তন হতে থাকে। আর তখন যদি কোনো পূর্ব ঘটিত ভয় মস্তিষ্কে আটকে যায়, তখনই সেটা ধীরে ধীরে ফোবিয়ায় রুপ নেয়। একসময় আর সেটা করা সম্ভব হয় না।

ফোবিয়া কত ধরণের?

সাধারণত চার ধরণের ফোবিয়া রয়েছে। যেমন,

১। অ্যানিমেল ফোবিয়া – সাপ, বাঘ, ভাল্লুক, মাকড়সা, তেলাপোকা ইত্যাদিতে ভয় পাওয়া।

২। ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট ফোবিয়া – উচ্চতার ভয়, দুর্যোগের ভয়, বজ্রপাতের ভয়, পানির ভয়, বাতাসের ভয় ইত্যাদি।

৩। সিচুয়েশন ফোবিয়া – বন্ধ ঘরে থাকার ভয়, চুপচাপ থাকার ভয়, বেশি কথা বলার ভয়, কারো সাথে নাচার ভয়, গান গাওয়ার ভয় ইত্যাদি।

৪। ব্লাড-ইনেজকশন-ইঞ্জুরি ফোবিয়া – রক্তের ভয়, আঘাতের ভয়, অসুস্থ হওয়ার ভয়, সেলাইয়ের ভয়, মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টের ভয় ইত্যাদি।

কিন্তু অনেক ফোবিয়াই আছে এই চার ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে না। আবার অনেক ফোবিয়া আছে যেগুলো বেশ উদ্ভট ধরনের। জানা অজানা অনেক ধরণের ফোবিয়াই রয়েছে। তবে স্বীকৃত ফোবিয়া হচ্ছে ৪০০ ধরণের।

আপনি ফোবিয়াগ্রস্থ কি না কীভাবে বুঝবেন?

ফোবিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ফিজিক্যাল ও মেন্টাল লক্ষণ দেখা দেবে। ফিজিক্যাল লক্ষণগুলো হচ্ছে,

  • শ্বাসকষ্ট
  • মাথা ঝিমঝিম করবে
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাবে
  • মন্থন পাকস্থলি
  • বুকের ব্যাথা
  • কপালের মাঝখানে কিছুটা রণন দেখা যাবে
  • শরীরে কাঁপুনি হবে
  • ঘাম বেড়ে যাবে

মানসিক লক্ষণগুলো হচ্ছে,

  • প্যানিক হবে
  • উদ্বিগ্নতা বাড়বে
  • খোলা বাতাসে বা খোলা জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছা হবে
  • নিজের মাঝে নিজে থাকার সম্ভাবনা দেখা যাবে না
  • নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা দেখা যাবে
  • নিজের অনুভুতিগুলোকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করবে
  • নিজের ভয়ের উপর রাগ উঠতে শুরু করবে
  • নিজের জীবনের উপর রাগ উঠবে

ফোবিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন যেভাবে

যখন উপরের লক্ষণগুলোর সাথে আপনার সমস্যাগুলো মিলে যাবে তখন আপনি নিজেকে একজন ফোবিক হিসেবে ভাবতে পারবেন। একজন ফোবিক হওয়ার পর আপনি চাইলে সাইকোথেরাপিস্ট দ্বারা আপনার সমস্যার সমাধান করতে পারেন কিংবা আপনি নিজে নিজেও সেলফ থেরাপি দিতে পারবেন। সেলফ থেরাপি সম্পর্কে আমি আরেকটি আর্টিকেলে কথা বলেছি। অনেক ধরণের সেলফ থেরাপি রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত আর সবচেয়ে সহজ থেরাপি হচ্ছে, সিবিটি বা কগনিটিভ বিহেভিয়েরাল থেরাপি। কগনিটিভ বিহেভিয়েরাল থেরাপি নিয়ে পড়তে, এখানে ঘুরে আসতে পারেন!

কগনিটিভ বিহেভিয়েরাল থেরাপি বা সিবিটি!

ফোবিয়া নিয়ে কিছু ফ্যাক্ট

১। ‘ফোবোফোবিয়া’ হচ্ছে ফোবিয়া হওয়ার ভয়।

২। নতুন একটা রিসার্চে দেখা গেছে যে, ফোবিয়া মূলত জেনারেশন ধরে ডি এন এর মাধ্যমে চলে আসে।

৩। অ্যালেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট, নেপোলিয়ন, মুসোলিনি এবং হিটলার, সবাই-ই এইলুরোফোবিয়া বা আইলুরোফোবিয়াতে ভুগতেন। আইলুরোফোবিয়া হচ্ছে বিড়ালে ভয় পাওয়া।

৪। ম্যাডোনা ব্রন্টোফোবিয়াতে ভুগছেন। ব্রন্টোফোবিয়া হচ্ছে বজ্রপাতে ভয় পাওয়া।

৫। গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশের বেশি নতুন ফোবিয়া তৈরি হয়েছে।

৬। ফোবিয়া সারানো সম্ভব।

৭। ফোবিয়া হয়ে যাওয়া মানে বা ফোবিয়া থাকা মানে পাগল হয়ে যাওয়া নয়।

স্টার্টআপ নিয়ে ৮ টি ফ্যাক্ট

স্মার্টফোন ফাস্ট করার ১১টি টিপস